জীবনের গল্প

এপিজে আব্দুল কালাম এর জীবনী থেকে অনুপ্রেরণা

এপিজে কালামের জীবনী

এপিজে কালামের জীবনী: আবুল পাকির জয়নুল-আবেদিন আবদুল কালাম যাকে আমরা এপিজে আবদুল কালাম নামে জানি। যিনি ভারতের একাদশতম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৩১ সালে ১৫ ই অক্টোবর রামেশ্বরামে এক দরিদ্র তামিল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

টিনেজার বয়স থেকেই পরিবার ও নিজের পড়াশোনার জন্য তাকে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই শুরু করতে হয়। সংবাদ পত্র বিক্রি করার মধ্য দিয়েই শুরু হয় ওনার কর্মজীবন, পাশাপাশি লেখাপড়াও।

তিনি ত্রিচুরাপল্লির সেন্ট জোসেফ কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই গ্রাজুয়েট হন। ছোট থেকেই তিনি পড়াশোনায় খুব মনোযোগী ছিলেন। কিন্তু গ্রাজুয়েট হওয়ার শেষ দিকে ফিজিক্সে তিনি উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। এই ৪ বছরের জন্য তিনি প্রচণ্ড আক্ষেপও করেন।

এপিজে আব্দুল কালামের জন্ম

এরপর তিনি নিজের মনের কথা শুনে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯৫ সালে মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি কলেজে ভর্তি হওয়ার মেধা লিস্টে ওনার নাম ওঠে ঠিকই কিন্তু সেখানে ভর্তি হওয়ার ফি ছিল হাজার টাকা।

যা সেই মুহূর্তে ওনার কাছে ছিল না। কিন্তু ওনার মা ও বোন ওনাদের সোনার গয়না বিক্রি করে ফি জোগাড় করেন। এরপর এপিজে আবদুল কালাম ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হন।

আব্দুল কালামের শিক্ষাজীবন

ওনার লেখাপড়ার প্রতি পরিবারের লোকজনের এই গভীর বিশ্বাস দেখে লেখাপড়ার প্রতি ওনার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। কলেজে কয়েকটি প্রজেক্টে ওনার প্রবল উৎসাহ দেখে একজন প্রফেসর ওনাকে একটি সিনিয়র ক্লাস প্রজেক্ট এর দায়িত্ব দেন।

আব্দুল কালামের শিক্ষাজীবন

কিন্তু সেটিতে প্রগ্রেস না দেখে তার কলেজের সেই প্রফেসর তাকে ভয় দেখান। ৩ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে ওনার বৃত্তি ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অবশেষে কালাম সেটি কমপ্লিট করেন এবং প্রফেসরকে খুশিও করেন।

এরপর ওনার জীবনে আরেকটি নতুন অধ্যায়। একদিকে আসে এয়ারফোর্স এবং অপরদিকে আসে ডিফেন্সের ডায়রেক্টটরেট অব টেকনিক্যাল ডেভলপমেন্ট প্রোডাকশনে কাজের সুযোগ। তিনি দুটোতে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। এয়ারফোর্সের জন্য দেরাদুনে এবং ডিফেন্সের জন্য দিল্লিতে ওনার ইন্টারভিউ কল আসে।

১ সপ্তাহ দিল্লিতে থেকে ডিফেন্সের ইন্টারভিউ দিয়ে তিনি সেখান থেকে দেরাদুনে চলে আসেন। সেখানে ২৫ জনের মধ্যে তিনি ৯ম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু সিলেকশন হয় অষ্টম স্থান পর্যন্ত। ফলে উনি একজন ফাইটার পাইলট হওয়ার সুযোগ হারান।

নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত না করতে পেরে খুব হতাশ হয়ে পড়েন কালাম। এরপর তিনি একদিন হৃষীকেশে গিয়ে স্বামী শিবানন্দ এর সাথে সাক্ষাৎ করে ওনাকে নিজের দুঃখের কথা, ইচ্ছে ও স্বপ্নের কথাগুলো জানান। সব শুনে স্বামীজী তাকে বলেছিলেন, “ইচ্ছে যদি সত্যি মন থেকে হয় তো তাতে একটা আলাদা জোর এবং শক্তি থাকে।

মানুষ যখন রাতে ঘুমায় তখন তার সেই ইচ্ছে শক্তি হারিয়ে যায়। কিন্তু প্রতিদিন যখন সে ঘুম থেকে উঠে তখন সেই ইচ্ছা শক্তি আরো প্রবল বেগে জেগে ওঠে। যদি তুমি সেই ইচ্ছাকে মনে বাঁচিয়ে রাখতে পারো তবেই তোমার সে স্বপ্ন সার্থক হবে।”

আব্দুল কালামের কর্মজীবন

এরপর তিনি ১৯৬০ সালে দিল্লিতে গিয়ে ইন্ডিয়ান ডিফেন্স মিনিস্ট্রিতে সিনিয়র সাইন্টিস হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন এ ট্রান্সফার হয়ে আসেন। এখানে তিনি SLV3 নামে স্যাটেলাইট তৈরির প্রজেক্ট এর হেড হিসেবে কাজ শুরু করেন।

আব্দুল কালামের কর্মজীবন

কিন্তু ১৯৭৯ সালে SLV3 মহাকাশে পাঠানোর ৩১৭ সেকেন্ডের মধ্যেই ভেঙে পড়লে আবদুল কালামকে কঠিন সময়ের সম্মুখীন হতে হয়। যার ফলে তিনি মানসিকভাবে বেশ কিছুদিন ভেঙে পড়েন। এরপর একটি প্রেস কনফারেন্সে যখন তাকে স্যাটেলাইট এর ব্যর্থতার কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন প্রফেসর সতীশ ধাওয়ান ওনার থেকে মাইক্রোফোন কেড়ে নিয়ে মিডিয়ার সকল প্রশ্নের উত্তর দেন।

তিনি বলেন, এগুলো খুব জটিল হিসেব। আমাদের নিজেদেরকেই ভুলটা খুঁজে বার করতে হবে এবং সংশোধন করতে হবে এবং লক্ষ্য রাখা হবে ঘটনাটি যাতে আবার রিপিড না হয়। তিনি আরো বলেন, আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে ১ বছরের মধ্যেই আমরা আরেকটি স্যাটেলাইট পাঠাতে সক্ষম হব।

পরবর্তীকালে কালাম যখন আবার নতুন একটি স্যাটেলাইট তৈরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন অনেকেই ওনাকে SLV3 এর ব্যর্থতার কথা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি তবুও নিজের মনের উপর জোর রেখে নিজের কাজের দিকে ফোকাস করতে থাকেন। ১৮ জুলাই, ১৯৮০ সালে রোহিনি স্যাটেলাইট লঞ্চ করা হয় এবং স্যাটেলাইটটি অরবিটে পৌঁছাতে সাকসেসফুল হয়। যা তাকে সফলতার শীর্ষে পৌঁছে দিতে একান্ত ভাবে সাহায্য করেছিল।

এপিজে আব্দুল কালাম এর রাজনীতি

এরপর তিনি আরও কয়েকটি প্রজেক্টের কাজ নিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেগুলি মন্ত্রিসভায় অ্যাকসেপ্টেড হয়নি। এরপর ১৯৯৮ সালে তিনি পরমাণু তত্ত্বের কয়েকটি সফল গবেষণা করেন। এই সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপাই তাকে মন্ত্রিত্বের পদ দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এপিজে আব্দুল কালাম এর রাজনীতি

যদিও পরবর্তীকালে নিজের যোগ্যতার তাগিদে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে সম্মানিত হন। এই পদে থাকাকালীন তিনি যেমন সম্মানিত ছিলেন, তেমনি সমালোচিতও হয়েছিলেন।

তিনি প্রথম রাষ্ট্রপতি ভবনের ইফতার পার্টি বন্ধ করার আদেশ দেন। কারণ হিসেবে পরবর্তীকালে জানা যায়, যে ওই পার্টি বাবদ ২২ লাখ টাকা খরচ করা হতো। তিনি সেই টাকা অনাথ আশ্রমের শিশুদের খাদ্য, পোশাক এবং কম্বল দান করার কাজে লাগাবার আদেশ দেন। শুধু তাই নয়, নিজের ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের অনেক অর্থই তিনি অনাথ আশ্রমে জন্য দান করতেন।

২০০৭ সালে তিনি স্বসম্মানের সহিত রাষ্ট্রপতি পদ ত্যাগ করেন। ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই আয়া এম শিলং এর ছাত্র দের ক্রিয়েটিং এণ্ড লেবাবেল প্ল্যানেট আর্থ বিষয়ে বক্তৃতা দিতে যান। নিজের বক্তৃতা দেওয়ার ৫ মিনিট সময়ের মধ্যেই তিনি হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এ আক্রান্ত হন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। রিপোর্ট অনুযায়ী তার এসিস্টেন্ট সৃজন পাল শিংকে বলা তার শেষ দুটি উক্তি ছিল, “Funny guy! Are you doing well?”

সবশেষে ওনার বলা আমার পছন্দের অন্যতম একটি সেরা উক্তি দিয়ে আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন- “Man needs his dufficulties because they are necessary to enjoy success.”

আব্দুল কালামের কিছু উক্তি

তুমি তোমার ভবিষ্যত পরিবর্তন করতে পারবে না কিন্তু তোমার অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারবে এবং তোমার অভ্যাসই নিশ্চিত ভাবে তোমার ভবিষ্যত পরিবর্তন করবে।

সফলতার গল্প পড়ো না কারন তা থেকে তুমি শুধু বার্তা পাবে। ব্যার্থতার গল্প পড় তাহলে সফল হওয়ার কিছু ধারনা পাবে।

তরুণ প্রজন্মের কাছে আমার আহ্বান হলো ভিন্নভাবে চিন্তা করার সাহস থাকতে হবে। আবিষ্কারের নেশা থাকতে হবে। যেপথে কেউ যায় নি, সে পথে চলতে হবে। অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস থাকতে হবে। সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে এবং তারপর সফল হতে হবে। এগুলোই হলো সবচেয়ে মহৎ গুণ। এভাবেই তাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। তরুণদের কাছে এটাই আমার বার্তা।

একজন খারাপ ছাত্র একজন দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে যা শিখতে পারে তার চেয়ে একজন ভালো ছাত্র একজন খারাপ শিক্ষকের কাছ থেকে অনেক বেশী শিখতে পারে ।

আর্টিকেলটি নিজের প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন স্পেশালি তাদের সাথে যারা এখনো স্টুডেন্ট। কারণ স্টুডেন্টদের জন্য এপিজে আব্দুল কালাম এর থেকে বড় ইন্সপায়ারেশন বোধয় আর কেহ নেই। সেই সাথে আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন এরপর আপনি কার জীবনের উপর জিরো টু হিরো আর্টিকেল দেখতে চান।

আরো পড়ুন- মালির ছেলে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো জীবনী থেকে অনুপ্রেরণা

আপনার মতামত দিন

error: Content is protected !!